ফরিদপুরে ২০১৮ সালের মধ্যে ঘটেছে এক জঘন্য হত্যা ও লাশ গুমের ঘটনা—এ মামলায় বৃহস্পতিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিশেষ জজ আদালত চারজনকে জাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং প্রতিজনকে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা দিয়েছেন। জরিমানা না দিলে প্রত্যেকের ওপর অতিরিক্ত এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড আরোপ করা হবে। একইসঙ্গে লাশ গুমের আলাদা অভিযোগেও প্রতিজনকে সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা বরাদ্দ করা হয়েছে; জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড কার্যকর হবে। আদালতের নির্দেশ অনুসারে দুই ধরনের সাজা একই সময়ে কার্যকর হবে।
আদালতে রায় ঘোষণা
ফরিদপুরের বিশেষ জজ (জেলা ও দায়রা জজ) মো. শরীফ উদ্দীন দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুবরণকারী ছিলেন হাসান শেখ (৩৫)। একই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্তরা হলো—হাসানের স্ত্রী ফরিদা বেগম (৩৮), ঝাউখোলা গ্রামের শাহজাহান মাতুব্বর (৪৪), ফারুক বিশ্বাস (৪৩) ও চান্দু শেখ (৩০)।
ঘটনাপ্রেক্ষিত ও মামলার সংক্ষেপ
পুলিশ ও মামলার কাগজি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৯ মে রাতে শাহজাহান মাতুব্বরের ফোনে বাড়ি থেকে বের হন হাসান। তিনি ছিলেন ঝাউখোলা গ্রামের একজন কৃষক ও ফরিদপুর শিশু পার্কে অস্থায়ীভাবে কর্মরত। ওই রাতের পর থেকে তিনি আর বাড়ি ফিরেননি। নিখোঁজের চার দিন পর ১৩ মে বিকেলে ঝাউখোলা গ্রামের একটি আখখেতে বস্তাবন্দী অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পরদিন ১৪ মে নিহতের পিতা ইমান উদ্দিন শেখ কোতোয়ালি থানায় ছয়জনের নামে হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগ দায়ের করেন। পরে পুলিশ তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মামলায় চারজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। মামলাটির সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) এস এম আজিজুর রহমান বিকু আদালতে বলেন—স্ত্রীর আয় ও পারিবারিক বিরোধসহ নানা বিষয় বিবেচনা করে পরিকল্পিতভাবে হত্যাটি সংঘটিত করা হয় এবং আদালতে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার পর কাঙ্ক্ষিত সাজা দেয়া হয়েছে।
রায় কার্যকরের পর কার্যক্রম
রায় ঘোষণার সময় বাদী পক্ষের উপস্থিতি ও ইভেন্ট সম্পর্কিত অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা চলার পর আদালত থেকে দণ্ডপ্রাপ্ত তিনজনকে গ্রেফতার করে জেলা কারাগারে হস্তান্তর করা হয়। ফরিদা বেগম আদালতে হাজির ছিলেন না; তিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন বলে খতিয়ানে দেখা গেছে। আদালত পূর্বের হাজতবাসের মেয়াদ সাজা থেকে কেটে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
- মৃত: হাসান শেখ (৩৫)
- দণ্ডপ্রাপ্ত: ফরিদা বেগম (৩৮) — পলাতক
- দণ্ডপ্রাপ্ত: শাহজাহান মাতুব্বর (৪৪)
- দণ্ডপ্রাপ্ত: ফারুক বিশ্বাস (৪৩)
- দণ্ডপ্রাপ্ত: চান্দু শেখ (৩০)
| অভিযোগ | সাজা | জরিমানা |
|---|---|---|
| হত্যার অভিযোগ | জাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড | ২০,০০০ টাকা (অানাদায়ে ১ বছর বিনাশ্রম) |
| লাশ গুম | ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড | ৫,০০০ টাকা (অানাদায়ে ৬ মাস বিনাশ্রম) |
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব
ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনার বিষয় ছিল। একটি পারিবারিক বিবাদ ও আর্থিক বিষয়কে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকেই দ্রুত ন্যায়বিচার দেখতে চেয়েছিলেন। রায় ঘোষণার পরে ক্ষতগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। আবার কিছু স্থানীয় বাসিন্দা বলছেন, দীর্ঘসময়ের পরও অভিযুক্তদের মধ্যে একজন এখনো পলাতক—তার দ্রুত গ্রেফতারের ওপরও জোর দেওয়া উচিত।
অপরদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন বলেছে, এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সমাজে সচেতনতামূলক ভূমিকা নেওয়া জরুরি। বিবাদ তীব্রভাবে জড়িয়ে গেলে তা পরিবারে অস্থিরতা ও অপরাধ বাড়ায়—এ কারণে স্থানীয় স্তরে সমঝোতা এবং সালিশ প্রক্রিয়া কার্যকর করার পরামর্শ দেন স্থানীয় কিছু সামাজিক নেতাও।
রায়টি নিশ্চিতভাবে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষের জন্য প্রতিকারমূলক—তবে স্থানীয় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসনের সজাগ দফতর কার্যক্রম, দ্রুত গ্রেফতার ও পুনর্বাসনমূলক উদ্যোগ দেখা প্রয়োজন বলে স্থানীয়রা মন্তব্য করছেন।
ফরিদপুর থেকে: বিপ্লব সরকার, ফরিদপুর প্রতিনিধি, WE NEWS