নওগাঁর মান্দা উপজেলার কয়েকটি হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি) গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহভাবে ধসে পড়েছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে, কোনো রকম প্রতিরক্ষামূলক গার্ডওয়াল দেওয়া হয়নি এবং প্রকৃতির চাহিদা মতো কাজ না করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রাক্কলনের অর্ধেকেরও কম অংশে কাজ শেষ দেখিয়ে সম্পূর্ণ বিল উত্তোলন করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রশাসনের ভূমিকা
স্থানীয় জনগণ ও সূত্র জানায়, উত্তরশ্রীরামপুর গ্রামের ওয়াহেদের মোড়ের পশ্চিম পার্শ্ব ও গণেশপুর ইউনিয়নের কারিগরপাড়া এলাকায় বেশ কয়েকটি স্থানে রাস্তা ধসে পড়েছে। ভূগভীর মাটি ধুয়ে সরে যাওয়ায় ইটের ফাঁক থেকে রাস্তাটি ম্লান হয়ে গেছে; ফলে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। রাস্তার পাশেই গভীর পুকুর থাকলেও কোনো রকম রক্ষামূলক গার্ডওয়াল রাখা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীরা উপজেলা প্রশাসনের নজরদারির অভাবকে এই অনিয়মের সরাসরি কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের যুক্তি—নির্মাণকালে উপজেলা দফতর থেকে মাঠ পর্যায়ের নিয়মিত তদারকি থাকলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সময়সূচি ভাঙতে পারত না এবং নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে সরকারি তহবিল লোপাটের সুযোগ পেত না।
পিআইও পরিদর্শন করলেও অনুসন্ধান চলমান
স্থানীয় অভিযোগের প্রেক্ষিতে গণেশপুর ইউনিয়নে সরেজমিন পরিদর্শনে যান উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আরিফুল ইসলাম। তবে স্থানীয়রা দাবি করেন, মাঠে প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যদি নিয়মিত পরিদর্শনে আসতেন, তাহলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এভাবে কাজ শিথিল করে পার পেত না।
কাঠামোগত অনিয়ম ও কৌশল
প্রকল্পের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, নির্ধারিত রুট অনুযায়ী ছাত্তারের বাড়ি থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা আলিম হাজীর বাড়ি এবং শ্রীরামপুর মালেক মুহুরীর বাড়ি থেকে ওয়াহেদের মোড় পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণের কথা ছিল। তবে বাস্তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছাত্তারের বাড়ি থেকে কারিগরপাড়া পর্যন্ত অর্ধেকেরও কম দূরতা সম্পন্ন করে সরে গেছে এবং বাকি অংশ ফাঁক রেখেছে।
আরও অভিযোগ আছে, কারিগরপাড়ার পুরোনো সরকারি ইটগুলো গোপনে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে; পরে সেই স্থানগুলো খুঁড়ে মাটিতে ভরাট করে কাজে শেষের ছাপ দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে অনুমোদিত উপকরণ ও নির্মাণমান রক্ষা করা হয়নি বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
প্রভাবিত এলাকায় বাস্তব চিত্র
স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, কাজ শেষের অজুহাতে অনেক বাড়ি এখনো রাস্তার কাজের বাইরে পড়ে আছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা আলিম হাজীর বাড়ির মত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক স্থান থেকেও সড়ক এখনও সংযুক্ত হয়নি; ফলে যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। এলাকাবাসী বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত না ঠিক হলে আগামী মৌসুমে চলাচলে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেবে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে।
- প্রভাবিত মূল স্থান: উত্তরশ্রীরামপুর (ওয়াহেদের মোড়), গণেশপুর (কারিগরপাড়া)
- অভিযোগ: নিম্নমানের ইট ব্যবহার, গার্ডওয়াল না থাকা, পুরোনো সরকারি ইট গোপন করে নেয়া
- প্রকল্পগত বিচ্যুতি: প্রাক্কলনের অর্ধেকেরও কম কাজ করা
কার্যসম্পন্ন বনাম প্রকৃত অবস্থা
| বিবরণ | নথিপত্রে উল্লেখ | বাস্তবে পাওয়া অবস্থা |
|---|---|---|
| রাস্তাগুলোর লক্ষ্যমাত্রা | ছাত্তারের বাড়ি — বীর আলিম হাজীর বাড়ি; মালেক মুহুরীর বাড়ি — ওয়াহেদের মোড় | কিছু অংশে কাজ অসম্পূর্ণ; নির্ধারিত রুটে মিল নেই |
| কাজের পরিমাণ | সম্পূর্ণ সড়ক নির্মাণ | অর্ধেকেরও কম দূরত্বে কাজ শেষ করা হয়েছে |
| নির্মাণমান | সরকারি মান অনুযায়ী ইট ও গার্ডওয়াল | নিম্নমানের ইট; গার্ডওয়াল নেই |
কী ব্যবস্থা হওয়া উচিত — স্থানীয়দের দাবি
ভুক্তভোগীরা স্পষ্ট দাবি করেছেন—উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তৎপর হয়ে পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্নির্মাণ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত শুরু করবে। তারা বলেন, সরকারি অর্থ লোন টুকু নয়; মানুষের সরাসরি চলাচল ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত এসব সড়ক দ্রুত স্থিতিশীল করা জরুরি।
এ ঘটনায় ঠিকাদার ও সাব-ঠিকাদারের ভূমিকা, স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি, এবং নথিপত্রে থাকলেও বাস্তবে না থাকা অংশ নিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয়রা বলেন, প্রশাসনিক উদাসীনতা আর অবহেলা থাকলে ভবিষ্যতেও সরকারি প্রকল্পে এমন অনিয়ম ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলামের দফতর পরিদর্শন করায় কাজের সঠিক চিত্র খতিয়ে দেখার একটি প্রাথমিক প্রচেষ্টা চালানো হলেও এখনো আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। কর্তৃপক্ষের বিবৃতি না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনার দায়সার বিশ্লেষণ সীমাবদ্ধ।