নেত্রকোণার সদর উপজেলায় গত ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নিখোঁজ হওয়া নাজমা আক্তার নাজু (৩৪)-র মাটিচাপা মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনার একদিনের বেশি তদন্তের পর শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মরদেহ উদ্ধারের পর একজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ অভিযোগ সূত্রে জানিয়েছে, আটক ব্যক্তি হলো নিহতের সাবেক স্বামী নুরুল আমীন (৪০)।
ঘটনার সারসংক্ষেপ ও পুলিশি তদন্ত
পুলিশের তল্লাশিতে জানা যায়, মরদেহটি নেত্রকোণা সদর উপজেলা মৌগাতী ইউনিয়নের খাটপুড়া ব্রিজ সংলগ্ন শ্মশানঘাটের পাশে থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে ঢুকিয়ালী নদীর পাড় থেকে মাটিচাপা অবস্থায় লাশ পাওয়া যায়। তদন্তে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা ব্যক্তির জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে এবং তার প্রদর্শিত স্থান থেকে নাজমার ব্যবহৃত ওড়না, মোবাইল ফোন ও জুতা উদ্ধার করা হয়েছে।
নেত্রকোণা মডেল থানা সূত্রে জানা গেছে, নিহতের ছোট ভাই মো. শুভ (১২) গত ২২ সেপ্টেম্বর সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডির ভিত্তিতে তদন্ত ত্বরান্বিত হলে সন্দেহের ভিত্তিতে নুরুল আমীনকে আটক করা হয়। পুলিশ বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার বিষয়টি স্বীকার করে মরদেহের অবস্থান জানানো করেছেন, যেখান থেকে মাটিচাপা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পূর্বপরিচয় ও পারিবারিক পটভূমি
পুলিশি বিবরণ অনুযায়ী, প্রায় ১৪ বছর আগে নাজমা ও নুরুল আমীনের বিয়ে হয়। তাদের দুইটি সন্তান রয়েছে—একজন ছেলে এবং একজন মেয়েমেয়ে—এবং পারিবারিক কলহের কারণে তারা একাধিকবার বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলন করলেও সর্বশেষ আলাদা ছিলেন। নিহত নাজমা সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে দেনমোহর ও ভরণপোষণের মামলা করেছিলেন, এছাড়া ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা অন্য একটি মামলার পিবিআই তদন্ত চলছে। বর্তমানে দুই সন্তান স্বজনদের হেফাজতে রয়েছে।
পুলিশের বর্ণনা অনুসারে হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যপট
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে প্রদানকৃত তথ্য অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নাজমা শহরে কীটনাশক কেনার সময় নুরুল আমীনকে ফোন করেন। বড়বাজার এলাকায় তাদের দেখা হলে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়, পরে স্থানীয়রা তাদের ভাগ করে দেয়। পরে ভরণপোষণের ৬ হাজার টাকা উদ্ধারের অস্বীকার বা সমঝোতার কথা বলে নাজমাকে রিকশায় রাজার বাজারে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে নুরুল আমীন ভাড়া করা মোটরসাইকেলে করে মৌগাতীর খাটপুড়া ব্রিজ এলাকায় নিয়ে যান।
রাতে সাড়ে ১০টার সময় টাকা দেওয়ার বিষয়ে আবারও তর্কে জড়িয়ে পড়ে দু'জনে। এক পর্যায়ে পুলিশ বলছে, নুরুল আমীন নাজমার বুকে আঘাত করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর নাজমাকে কাঁধে করে পাশে থাকা শ্মশানঘাটে নিয়ে গিয়ে নিজের ওড়না দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় এবং পরে মরদেহটি ঢুকিয়ালী নদীর তীরে নিয়ে গিয়ে কোদাল দিয়ে গর্ত করে মাটিচাপা দেওয়া হয়।
প্রাণভয়ে ঘটনার স্থান ও উদ্ধারকৃত সামগ্রী
নেত্রকোণা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল খায়ের জানান, আটককৃতের প্রদর্শিত স্থান থেকে নাজমার ব্যবহৃত ওড়না, মোবাইল ফোন ও জুতা উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনার প্রমাণ সংগৃহীত করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ হাসপাতালের মর্গে পাঠাবে এবং মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
- নিখোঁজের তারিখ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- মরদেহ উদ্ধার: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (মাটিচাপা অবস্থায়)
- আটক: সাবেক স্বামী নুরুল আমীন (৪০)
স্থানীয় সূত্রে ও পুলিশের প্রাথমিক বিবরণে উঠে এসেছে যে পারিবারিক বিবাদ ও আইনি প্রতিশোধগত বিষয়গুলো এই ঘটনায় প্রেক্ষাপট হিসেবে উপস্থিত ছিল। তবে বিজ্ঞ ময়নাতদন্ত ও আইনি তদন্ত ছাড়া হত্যার পূর্ণ প্রেক্ষিত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
স্থানীয় প্রভাব ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
একটি পরিবারের সংঘর্ষ ও তা থেকে উত্পন্ন একাধিক মামলার পটভূমি নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত এমন ঘটনায় যেখানে দুই সন্তানের মা হীন শক্তিতে পড়ে প্রাণ হারালেন, স্থানীয় সমাজে নারীর নিরাপত্তা ও বিবাহবিচ্ছেদের পর সহিংসতার ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এলাকাবাসী ও পরিবারীয় সদস্যরা দ্রুত ন্যায় ও নিরাপত্তা দাবি করছেন।
এ পর্যন্ত পুলিশ নিহতের ছোট ভাইকে বাদী করে হত্যার মামলা গ্রহণ করেছে এবং অভিযুক্তকে আজ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। মামলার পরবর্তী ধাপ, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও আদালতের আদেশ ঘটনাটির চূড়ান্ত বিচার নির্ধারণ করবে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশি বিভাগ বিষয়টি জোরালোভাবে অনুসরণ করছে বলে জানানো হয়েছে।