উত্তরবঙ্গের অন্যতম শিল্পবৃত্তি হিসেবে গড়ে তোলা সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদেশি বা ব্যক্তিগত কোনও উদ্যোগ নয়—এটি ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়োজিত এক প্রকল্প। তবে বিসিক এবং পিজিসিএলের মধ্যে চলমান কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় উদ্যোক্তারা আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
অগ্রিম পরিশোধের পরও কাজ আটকে
শিল্পপ্লটগুলোর গ্যাস-সংযোগের অভ্যন্তরীণ পাইপলাইন নির্মাণের দায়িত্বে থাকা পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (পিজিসিএল) কাছে ৭৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা জমা দিলেও পিজিসিএল পার্কের ভেতরে কাজ শুরু করেনি। সূত্রে জানা যায়, কোম্পানিটি পার্কের প্রধান ফটক পর্যন্ত পাইপলাইন বসিয়েছে, কিন্তু ভেতরের নেটওয়ার্ক স্থাপন বন্ধ রেখে দিয়েছে।
এই বিলম্বের ফলে শিল্পপার্কের উদ্যোক্তারা তাদের কার্যক্রম শুরু করতে পারছেন না। দেশে গ্যাস সংকটের পরিস্থিতি থাকলেও যেসব প্লট আগে থেকেই গৃহীত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্যাস সংযোগের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য স্থবিরতা নতুন সমস্যা সৃষ্টি করেছে।
সময়সূচি ও প্রশাসনিক তাগিদ
প্রকল্পটি ২০১০ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়ার কথা ছিল, এবং প্রথমে ২০১৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে মোট সাত দফা মেয়াদ বাড়ানো হলেও অনেক অবকাঠামো এখনও অসম্পূর্ণ রয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্প ‘সমাপ্ত’ বলে দেখানো হয়েছে, তবু বাস্তবে বেশ কিছু কাজ বাকি রয়েছে।
সরকারি পর্যায়ে বিষয়টি জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ওঠে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যিক নিরীক্ষা অধিদপ্তর অনিয়ম সংক্রান্ত একটি মেমো জারি করে এবং ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে তাগিদপত্র পাঠানো হয়। এরপর ২০ এপ্রিল শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিসিক শাখাও দ্রুত গ্যাসলাইন স্থাপনের নির্দেশ দেয়।
“পিজিসিএল অভ্যন্তরীণ গ্যাসলাইন স্থাপনের কাজ শেষ না করায় উদ্যোক্তারা বিসিককে চাপ দিচ্ছেন।”
এই কথা বলেছেন সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্কের প্রধান কর্মকর্তা হিরণ্ময় বর্দ্ধন। তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, সমস্যার মূল নড়াচড়া পিজিসিএলের অভ্যন্তরীণ কাজের অনিশ্চয়তা।
উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ ও সম্ভাব্য আর্থিক ঝুঁকি
সরাসরি গ্যাস সংযোগ না থাকায় উদ্যোক্তারা উৎপাদন শুরু করতে পারছেন না; ফলে বিনিয়োগের ইচ্ছা কমছে এবং কিছু ক্ষেত্রে কিস্তি দিয়ে পরিশোধ করা অর্থ স্থবির হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কাজ শেষ না হলে উদ্যোক্তারা কিস্তি বন্ধ করে দিতে পারেন—এটি ব্যবসায়িক ক্ষতির পাশাপাশি আইনগত জটিলতাও ডেকে আনতে পারে।
- অগ্রিম জমা: ৭৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা (২০২২-০৬-২০)
- পার্ক এলাকার আয়তন: প্রায় ৪০০ একর
- প্রকল্প শুরুর বছর: ২০১০ (জুলাই)
- অডিট মেমো: ২০২৫-০৯-১১
কীভাবে এগোবে—প্রশাসনিক ফলোআপ
বিসিক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি তারা পিজিসিএলের কাছে একাধিকবার জানিয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও তাগিদ দিয়েছে। বিসিক আবারও পজিশন নেয়া, তাগাদা জারি করা এবং তদারকি বাড়ানোর পরিকল্পনা করবে বলে সূত্র জানায়। তবে বাস্তববাদী পর্যবেক্ষকরা বলছেন—কেবল নির্দেশনা দেওয়া যথেষ্ট হবে না; দ্রুত মাঠ পর্যায়ে কার্যনির্বাহী মনিটরিং ও সময়সীমা নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করান যে, শিল্পপার্কের মতো জোনগুলোর সফলতা নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে। গ্যাস লাইনে দীর্ঘস্থায়ী বিলম্ব হলে স্থানীয় কর্মসংস্থান, কাঁচামালের ক্রয়শক্তি এবং সার্বিক অর্থনৈতিক চেইনে ঝুঁকি দেখা দেয়।
স্থানীয় উদ্যোক্তারা এখন বিসিক ও পিজিসিএলের মধ্যে দ্রুত সমাধান চান—নিষ্ঠুর সময়সীমা, প্রকল্পের সম্পূর্ণ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সূচি দেওয়া এবং কাজ দ্রুত শেষ না হলে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে।