চাঁদপুরে ইলিশ মাছসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রির ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে অনলাইনে টাকা আত্মসাৎ করা একটি প্রতারক চক্রের তিনজন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে জেলা পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের জেলা পুলিশ শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে আদালতে সোপর্দ করেছে বলে চাঁদপুর জেলা পুলিশের মিডিয়া সেল জানায়।
গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন — মো. সুমন ভূঁইয়া, মো. সাইফুল ইসলাম মামুন ও অনিক অধিকারী। তারা সবাই নড়াইল জেলার কালিয়া থানা এলাকার বাসিন্দা; চাঁচুড়ী ও পেড়লী ইউনিয়নে তাদের বাড়ি রয়েছে।
অভিযান ও জব্দকৃত সামগ্রী
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুর জেলা পুলিশের এলআইসি শাখা ও জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) যৌথ টিম তথ্যপ্রযুক্তি সমর্থনে দীর্ঘ তদন্ত করে আসামিদের অবস্থান নির্ণয় করে। এরপর নড়াইলের কালিয়া থানার বিভিন্ন স্থানে গত ১৪ ও ১৫ অক্টোবর অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযান শেষে ১৬ অক্টোবর তারা চাঁদপুরে ফিরিয়ে আনা হয় এবং ১৭ অক্টোবর আদালতে সোপর্দ করা হয়।
গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে আছে ৮টি মোবাইল ফোন এবং একাধিক সিমকার্ড। পুলিশ জানায়, এই সিমগুলো অন্যের নামে নিবন্ধিত ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
প্রতারণার কৌশল ও শিকারের تجربা
পুলিশ অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রটি ফেসবুকের নানা পেজ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে তা সম্পাদনা করত এবং ভুয়া পেজ খুলে ইলিশ, ফার্নিচার, জুতা, শিশুদের খেলনা, মোটরবাইক পার্টসসহ বিভিন্ন পণ্যের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিত। অনলাইন চাকরির মিথ্যা বিজ্ঞাপনও তারা প্রয়োগ করত।
- বিজ্ঞাপনগুলো জোরদার করার জন্য পেইড বুস্টিং করত এবং কৃত্রিম পজিটিভ মন্তব্য যোগ করত।
- ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করে মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো বা ফোন কল করত।
- বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, ভুয়া ঠিকানা, নকল ট্রেড লাইসেন্স ও কপি করা ক্যাশ ভাউচার দেখাত এবং কৃত্রিম ওয়েবসাইট বানাত।
- অগ্রিম টাকা পেলে পণ্য পাঠানোর পরিবর্তে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে টাকা আত্মসাৎ করত তারা।
চাঁদপুর মডেল থানায় এই ঘটনায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ধারাসহ দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার নথিভুক্তি সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী ওই মামলাগুলো যথাক্রমে ২১ আগস্ট এবং ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
চলমান তদন্ত ও স্থানীয় সতর্কতা
পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানের নির্দেশনায় এসআই আনছার উল্লাহ, এসআই জিয়াউল হক জিয়া, এএসআই মোহাম্মদ ইলিয়াছ ও এএসআই জহির উদ্দিনের সমন্বয়ে একটি টিম কাজ করেছে। জেলা পুলিশের মিডিয়া সেল জানিয়েছে, পূর্বে একই চক্রের আরও ছয়জনকে গ্রেফতার করার পর মোট গ্রেপ্তারকৃতের সংখ্যা এখন নয়জনে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় বাজারে ইলিশ বিক্রি নিয়ে প্রচলিত অনলাইনে লোভনীয় অফারের ফলে গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন—অনেকে অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে পণ্য পাচ্ছেন না। এমন ঘটনায় বঞ্চিতদের ক্ষতিপূরণ বা সম্পদ ফেরত সংক্রান্ত আইনগত ও বাস্তব সমস্যাও রয়েছে, যা তদন্ত শেষে বিচারিক প্রক্রিয়ায় সমাধান করা হবে।
পাঠকের জন্য কীভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখা যাবে
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে চাঁদপুরের ক্রেতাদের উদ্দেশ্যে পুলিশ ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সহজ সতর্কতা শেয়ার করেছেন:
- কোনো পণ্যের ক্রয়ে ভুয়া পেজ বা অচেনা বিক্রেতার সঙ্গে প্রথমেই না গিয়ে তাদের প্রকৃত পরিচয় যাচাই করুন।
- নির্ভরযোগ্য পেমেন্ট মাধ্যম ব্যবহার করুন এবং অগ্রিম টাকা পাঠানোর আগে বিক্রেতার ট্রেড লাইসেন্স ও অফিসিয়াল ঠিকানা যাচাই করুন।
- শংকার সময় নিকটস্থ থানায় অভিযোগ করুন এবং পেমেন্ট রেকর্ড সংরক্ষণ রাখুন।
চাঁদপুরে অনলাইন বাণিজ্য দ্রুত বাড়লেও প্রতারকদের ব্যবস্থাপনায় পুলিশ ও প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ জোরদার করছে বলে জেলা পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| গ্রেফতারকৃত নতুন সদস্য | ৩ জন (মো. সুমন ভূঁইয়া, মো. সাইফুল ইসলাম মামুন, অনিক অধিকারী) |
| মোট গ্রেফতারকৃত | ৯ জন |
| জব্দকৃত সামগ্রী | ৮টি মোবাইল ফোন, বহু সিমকার্ড |
| নথিভুক্ত মামলার ধারাসমূহ | সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬; দণ্ডবিধি ৪০৬ ও ৪২০ |
চাঁদপুরের অনলাইন বাণিজ্যে প্রতারণা রোধে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সমন্বিত কার্যক্রম এখন সব দিক দিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। অভিযোগ বা তথ্য থাকলে পুলিশ লাইনে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
বেলাল হোসেন, চাঁদপুর প্রতিনিধিত্বে, WE NEWS