মৌলভীবাজারের কাছের এক বিশাল মিঠাপানির জলাভূমি হাকালুকি হাওর দখল ও দূষণের মাত্রা বাড়ায় সংকটের মুখে। স্থানীয়রা বলছেন, বিল ভরাট হওয়ায় হাওরের গভীরতা কমেছে, মাছের ধরনের বৈচিত্র্য হারাচ্ছে এবং পানির মধ্যে প্লাস্টিক ও বর্জ্য ভেসে বেড়াচ্ছে।
স্থানীয়দের চিত্র: ভয়াবহ পরিবর্তন
জুড়ী উপজেলার হাওরপারের বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, গত কয়েক বছরে হাওরের পরিবেশ বদলে গেছে। আগে যেখানে ১৫-২০ ফুট গভীরতা ছিল, এখন একই স্থানে পানির গভীরতা অবনতি করে ৫-৭ ফুট পর্যন্ত নেমে এসেছে। পলি ও বালু জমে বিলগুলো ভরাট হওয়ায় মাছ ধরা এবং কৃষিকাজে প্রভাব পড়েছে।
“হাকালুকি হাওরে আগের মতো মাছ মেলে না। হাওরের পানির নিচে হাত দিলেই শুধু প্লাস্টিক হাতে আসে। হাওরের গভীরতা অনেকটাই কমে গেছে। আগে যে জায়গায় ১৫-২০ ফুট গভীর পর্যন্ত পানি ছিল, এখন সেই জায়গায় মাত্র ৫-৭ ফুট। পলিমাটি ও বালু এসে ধীরে ধীরে বিলগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। সরকারিভাবে হাওর রক্ষার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।” — রায়হান আহমেদ, জুড়ী হাওরপারের বাসিন্দা
পরিমাণগত চিত্র ও বিস্তৃতি
উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, হাকালুকি হাওরের মোট আয়তন প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর, যার মধ্যে বিলগুলোর মোট আয়তন প্রায় ৪ হাজার ৪০০ হেক্টর। কাগজে-কলমে এখানে মোট ২৩৮টি বিল ধরেছে হলেও অনেকে বলছেন, বাস্তবে অনেক বিলই বস্তিত হয়েছে বা অস্তিত্ব হারাচ্ছে। ২০১৫ সালের একটি জরিপে এখানে ১৪৩ প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া গিয়েছিল; কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এখন সেই বৈচিত্র্য কমছে।
| বিষয় | সংখ্যা/আয়তন |
|---|---|
| হাওরের মোট আয়তন | ১৮,০০০ হেক্টর |
| বিলগুলোর আয়তন | ৪,৪০০ হেক্টর |
| কাগজে-কলমে বিদ্যমান বিল | ২৩৮টি |
| ২০১৫ সালের জরিপে পাওয়া দেশীয় মাছ | ১৪৩ প্রজাতি |
কারণ: বালু ও বর্জ্য, সেচ-সহ অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার
স্থানীয়রা এবং প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, হাওরে পলি-বালু এসে জমা হচ্ছে। এতে বিলগুলো ভরাট হচ্ছে এবং মিঠাপানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাঁধা পড়ছে। এছাড়া নির্বিচারভাবে সেচ, মাছ শিকার ও কীটনাশক ব্যবহারে মাছের প্রজাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দখল করে জমি তৈরির ফলে হাওরের উপরিভাগও হ্রাস পাচ্ছে।
বাস্তব প্রভাব: জীবিকা ও পরিবেশ দুটোই সংকটাপন্ন
হাকালুকি হাওরসহ এর আশেপাশের এলাকায় শতশত মানুষ মৎস্যচাষ, পোদ-বন ও কৃষি নির্ভরভাবে জীবিকা নির্বাহ করে। বিল সংকুচিত হওয়ায় মাছের বিপর্যয় সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য ভেসে বেড়ালে পরিবেশ দূষণ বাড়ে এবং মানবস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ে।
স্থানীয় দাবি ও প্রয়োজনীয়তা
বাসিন্দারা দাবি করেন, হাওর রক্ষার জন্য জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। তারা চান—পলি খনন করে বিল পুনরুদ্ধার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, হাওরের পরিবেশগত সীমা নির্ধারণ ও আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা। অনেকে বলে থাকেন, প্রশাসনের সরকারি উদ্যোগ না থাকায় আশঙ্কা বাড়ছে।
- পলি উচ্ছেদ করে বিলগুলো পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে প্লাস্টিক নিষ্কাশন এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করতে হবে।
- অবৈধ দখল নিরোধ করে হাওরের সংরক্ষিত অঞ্চল চিহ্নিত করতে হবে।
প্রতিবেদন অনুসারে, হাকালুকি হাওরের ভৌগোলিক বিস্তার মৌলভীবাজারের বড়লেখা, কুলাউড়া, জুড়ী ও সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার জেলায় বিস্তৃত। এই বিস্তৃত অঞ্চলে হাওর সংরক্ষণ ব্যর্থ হলে অঞ্চলের বহু মানুষের আয়-জীবিকা ও স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে হাওর সংরক্ষণ ও পুনর্গঠনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি ঘোষণা বা কার্যকরী কর্মসূচির তথ্য প্রতিবেদনে নেই। পরিবেশ ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান উঠেছে বেসরকারি ও স্থানীয় পর্যায় থেকে।